ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি, অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। ভৌগোলিক দিক থেকে ইরান একটি বিশাল রাষ্ট্র—আয়তনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ গুণ বড়। কিন্তু জনসংখ্যা ও আয়তনের এই পার্থক্য সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও ক্ষমতা রক্ষার প্রশ্নে যে নির্মম বাস্তবতা সামনে আসে, তা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৩৬ দিনের আন্দোলনে বাংলাদেশে নিহত হয়েছিলেন প্রায় ৮ শত মানুষ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলা হয়েছে, এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জন্য তার কঠোর সমালোচনা হয়েছে। আমিও মনে করি, ক্ষমতা রক্ষার জন্য গুলি করে মানুষ হত্যা করা অন্যায়, অমানবিক এবং নিন্দনীয়।
কিন্তু একই সময়ে ইরানে মাত্র ১৫ দিনের আন্দোলনে নিহত হয়েছেন প্রায় ১২ হাজার মানুষ। সংখ্যার হিসেবে দেখলে, ১৫ দিনের আন্দোলনে ইরানে নিহত মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি। আর সময়ের বিবেচনায় এই হত্যাকাণ্ড তুলনা করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ গুণ। এই পরিসংখ্যান কোনো আবেগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভয়াবহতার একটি নগ্ন চিত্র।
আরও বিস্ময়কর তুলনা করা যায় ২০২৫ সালের ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের সঙ্গে। পুরো এক বছরে, অর্থাৎ ৩৬৫ দিনে, এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৫শ মানুষ। সেই হিসেবে মাত্র ১৫ দিনে ইরানের খামেনি শাসকের হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা রুশ–ইউক্রেন যুদ্ধের এক বছরের হতাহতের প্রায় ৫ গুণ বেশি। সময়ের অনুপাতে বিবেচনা করলে এই ব্যবধান হয়ে ওঠে বহু গুণ ভয়াবহ।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ইরানের মোল্লাতন্ত্র কতটা নিষ্ঠুর, বর্বর ও হৃদয়হীন হলে এমন হত্যাযজ্ঞ সম্ভব? এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ইসলামি শাসক মোল্লাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য চালানো গণহত্যার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।
যদি ৩৬ দিনে ৮শ মানুষ মারার জন্য শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলা হয়, তাহলে ১৫ দিনে ১২ হাজার মানুষ মারার জন্য খামেনিকে কী বলা উচিত? ক্ষমতা রক্ষার জন্য শেখ হাসিনার গুলি করে মানুষ হত্যা যদি অন্যায় হয়—যা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—তাহলে ক্ষমতা রক্ষার জন্য খামেনির গুলি করে মানুষ হত্যা কীভাবে ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায়? শুধু মার্কিন বিরোধিতার কারণে? এই যুক্তি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
শেখ হাসিনাও তার বিরুদ্ধের আন্দোলনকে মার্কিন ষড়যন্ত্র, জামায়াত-জঙ্গি, স্বাধীনতাবিরোধী ও বিএনপির চক্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিএনপির অংশটি বাদ দিলেও বর্তমান বাস্তবতা কি পুরোপুরি তার বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করে? তার অবশ্যই দায় আছে, কিন্তু শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে বিদেশি অর্থায়নপুষ্ট সংস্থা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গোপন ভূমিকা কি একেবারেই ছিল না? এই বিষয়ে কি কিছু নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হয়নি?
তাহলে ইরানে যে ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লক্ষাধিক মানুষ আহত ও কারাবন্দী হয়েছেন—তারা সবাই কি মোসাদ এজেন্ট, দেশদ্রোহী কিংবা ধর্মদ্রোহী? এই দাবি কি বাস্তবসম্মত, নাকি এটি কেবল দমন-পীড়নকে বৈধতা দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ভাষ্য?
অনেকে প্রশ্ন করেন, তাহলে এখনো ইরানের মোল্লাতন্ত্র টিকে আছে কেন? উত্তরটি কঠিন হলেও পরিষ্কার—সেনাবাহিনী, পুলিশ, সরকার ও প্রশাসনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার নীরব সমর্থনও এই শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশেও যদি সেনাবাহিনী পুরোপুরি হাসিনার পক্ষে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াত, যদি ডিপ স্টেট ভিন্ন ভূমিকা না রাখত, তাহলে কি জুলাই অভ্যুত্থান সফল হতো?
আজ ইরানে দেখা যাচ্ছে, বেসামরিক এলাকায় ভারী সামরিক মেশিনগান, সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে, সামরিক বাহিনী রাস্তায় টহল দিচ্ছে। এটি আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়—এটি আন্দোলন দমনের জন্য সরকারের যুদ্ধ প্রস্তুতি। প্রশ্ন হলো, এই বাহিনীগুলো যদি একদিন বন্দুকের নল শাসকের দিকে ঘুরিয়ে দিত, তাহলে কি মোল্লাতন্ত্র একদিনও টিকে থাকতে পারত?
0 Comments