ইরান — এক সময়ের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, কবিতা ও সভ্যতার দেশ — আজ ধর্মীয় একনায়কতন্ত্রের শিকার। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা প্রথমে জনগণের কাছে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখালেও পরবর্তীতে সেই শাসনব্যবস্থা ইরানের মানুষকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করেছে।
ইরানের নারীরা, যারা একসময় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন, খোমেনির ইসলামি প্রজাতন্ত্রে তাদের মৌলিক অধিকার হারান। বাধ্যতামূলক হিজাব আইন, নারীদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নিষেধাজ্ঞা— এসব ছিল নারী নিপীড়নের প্রকাশ্য রূপ। ধর্মীয় পুলিশ, যাদের “গাইডেন্স পেট্রোল” বলা হয়, তাদের হাতে অসংখ্য নারী অপমানিত ও নিহত হয়েছেন।
এই বর্বরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে মাহসা আমিনি। ২০২২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, মাত্র ২২ বছর বয়সী এই কুর্দি-ইরানি তরুণীকে “ঠিকভাবে হিজাব না পরা”র অভিযোগে গ্রেপ্তার করে ধর্মীয় পুলিশ। কিছু ঘণ্টার মধ্যেই তাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইরানি সরকার দাবি করে, হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ফাঁস হওয়া মেডিকেল রিপোর্টে স্পষ্ট হয়— মাহসা আমিনিকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছিল। তার মাথায় আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়, এবং সেই আঘাতেই তার মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনার পর ইরানজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা শুধু এক নারীর মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল গোটা ইরানি জাতির স্বাধীনতার আর্তনাদ।
একইভাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, Nova সঙ্গীত উৎসব-এ ঘটে আরেক ভয়াবহ অধ্যায়। ২২ বছর বয়সী জার্মান-ইসরায়েলি তরুণী শানি নিকোল লুক, যিনি একজন ট্যাটু শিল্পী ও প্রভাবশালী, হামাসের নৃশংস হামলায় নিহত হন। হামলার পর তার মরদেহ গাজা শহরের রাস্তায় পিকআপ ট্রাকের পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, যা পরে বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এটি ছিল উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে মানবতার এক নির্মম সতর্কবার্তা।
এইসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ধর্মীয় চরমপন্থা ও রাজনৈতিক ইসলামের নামে যে বর্বরতা চালানো হয়, তার শিকার হয় সাধারণ মানুষ, বিশেষত নারী। ইরানে, আফগানিস্তানে, এমনকি অন্যান্য মুসলিম দেশেও ধর্মের ব্যাখ্যার নামে নারীদের উপর যে দমননীতি চালু হয়েছে, তা মানবতার পরিপন্থী।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আজও কিছু মানুষ— এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও— খোমেনি ও খামেনির মতো একনায়কদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছে, মিছিল করছে, জানাজা পড়ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-র গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নেতৃত্ব দিয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, যিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির-এর সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।
একই সময়ে, মাহসা আমিনির মতো নারীদের হত্যার প্রতিবাদে কেউ মিছিল করে না, কেউ জানাজা পড়ে না। এ যেন সত্য ও মানবতার চরম পরিহাস।
আজ সময় এসেছে, মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে ভাবার — ধর্ম নয়, মানবতা হোক আমাদের একমাত্র পরিচয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনির শাসন যদি আমাদের কিছু শেখায়, তবে তা হলো: স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার ধর্মীয় জুলুমের ছায়ায় টিকে থাকতে পারে না।
0 Comments